সুজলা, সুফলা বাংলাদেশের ভূপ্রাকৃতিক ও কৃষি-বৈচিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক অঞ্চল হল বরেন্দ্র। বরেন্দ্রর সীমানা পশ্চিমে গঙ্গা ও মহানন্দা, পূর্বে করতোয়া, দক্ষিণে পদ্মা এবং উত্তরে কুচবিহার ও তরাই অঞ্চলের মধ্যবর্তী ভূভাগ যার বেশিরভাগই পুরাতন পলি সংবলিত। পন্ডিতগণ এ বিষয়ে একমত যে, বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজশাহী (বর্তমানে রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ), বগুড়া (বর্তমানে বগুড়া, ও জয়পুরহাট), রংপুর (বর্তমানে রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও গাইবান্ধা ), দিনাজপুর (বর্তমানে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও এবং পঞ্চগড়), এবং পাবনা (বর্তমানে পাবনা ও সিরাজগঞ্জ) জেলা বা এর (ক্ষেত্র বিশেষে) অংশসমূহ নিয়ে বরেন্দ্র অঞ্চল গঠিত।
ঐতিহাসিকতায়, বরেন্দ্র
ঐতিহাসিকভাবে, বরেন্দ্র উত্তর বঙ্গের প্রাচীন জনপদ পুন্ড্র বা পুন্ড্রবর্ধনের সঙ্গে সমবিস্তৃত একটি প্রাচীন ভৌগোলিক অঞ্চল, যা প্লিস্টোসিন যুগীয় ভূগঠন বারিন্দ ভূভাগে অবস্থিত। আর ভৌগোলিকভাবে, বরেন্দ্র ভূমি হলো বেঙ্গল বেসিনের বৃহত্তম প্লেইস্টোসিন যুগের ফিজিওগ্রাফিক ইউনিট।
জলবায়ুতে বরেন্দ্র
বরেন্দ্রভূমির অবস্থান গ্রীষ্মপ্রধান মৌসুমিমন্ডলে। এই অঞ্চলের জলবায়ু সাধারণভাবে উষ্ণ ও আর্দ্র। গ্রীষ্মে অত্যধিক তাপমাত্রা এবং শীতে অত্যধিক ঠান্ডাই হচ্ছে বরেন্দ্রভূমির আবহাওয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দেশের অন্যান্য এলাকার জলবায়ু থেকে সুস্পষ্টরূপে পৃথক অধিকতর পুরাতন পলল গঠিত এই ভূ-প্রাকৃতিক এককে চরম জলবায়ু পরিলক্ষিত হয়।
ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনামলের কিছু রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে বরেন্দ্রভূমির প্রায় ৪২ শতাংশ এলাকা বনভূমি দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। ১৮৪৯ সালের ভূমি জরিপ পরিসংখ্যানের তথ্য থেকে পাওয়া যায় যে, বরেন্দ্রভূমির প্রায় ৫৫ শতাংশ জমি জুড়ে বিস্তৃত ছিল বনভূমি। কিন্তু ১৯৭৪ সালে দেখা যায় যে, জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি এবং সেই সঙ্গে ভূমিরূপের পরিবর্তনের ফলে বরেন্দ্রভূমির প্রায় ৭০ ভাগ এলাকাই কৃষিজমিতে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছে।
উন্নয়নে বরেন্দ্র
১৯৮০ সালের মধ্যভাগে বরেন্দ্র এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে সেচ সুবিধা উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প (Barind Integrated Area Development Project) গ্রহণ করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় বরেন্দ্র এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে কৃষি সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে সেচকার্যের উদ্দেশ্যে প্রায় তিন হাজারেরও অধিক গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়। এই উদ্যোগ গ্রহণের ফলে এতদঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং এলাকাটি খাদ্য উদ্বৃত্ত অঞ্চলে পরিণত হয়। কৃষি সুবিধা প্রদান করা ছাড়াও বরেন্দ্র অঞ্চলের পরিবেশ অবক্ষয় রোধ করার লক্ষ্যে এই প্রকল্পের উদ্যোগে বৃক্ষ রোপণ এবং পুকুর ও খাল খননের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। পরিবেশ অবক্ষয় প্রতিরোধ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে এবং সেইসঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে তাপমাত্রার হ্রাস ঘটানো, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং অধিকতর উদ্ভিদ আচ্ছাদন তৈরি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
১৯৯০ সালের প্রথমার্ধে এই প্রকল্পটিকে নতুনভাবে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (Barind Multipurpose Development Authority) নামে নামকরণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে পাঁচ হাজারের বেশি নলকূপ ভূগর্ভস্থ পানি আহরণ করছে। এর সুফল যেমন আছে, তেমনি কিছু বিরূপ ভূপ্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বর্তমানে কিছু এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমান্বয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। একটি সমন্বিত পানি ও ভূমি ব্যবস্থাপনার দ্বারা বরেন্দ্র এলাকার উন্নয়ন না করলে বর্তমান ভূগর্ভস্থ পানি নির্ভর সেচ প্রকল্পটি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে এবং অনাকাংখিত পরিবেশগত প্রতিক্রিয়া/বিপর্যয় তৈরি করতে পারে